Post# 1517122011

28-Jan-2018 12:46 pm


খবর:

গোড়ান এলাকার সর্বত্রই ছিল জিসানের বিচরণ। ভালো বাইক চালাতে পারতো জিসান। যে কারো বাইক পেলেই আর কথা নেই। ঘুরে বেড়াতো আশপাশের এলাকাতে। পড়ালেখায়ও ছিল বেশ ভালো। এবছর স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছে। উত্তর গোড়ান এলাকায় তার বাবার একটি রিকশার গ্যারেজ আছে। সুযোগ পেলেই সেখানে ঢুঁ মারতো। আর গত শুক্রবার বিকালে সেই গ্যারেজে ঢুঁ মারাই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যারেজের কয়েকজন রিকশাচালক টাকার লোভেই তাকে অপহরণ করে। পরে ওইদিনই সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে তাকে হত্যা করে। পরে তাকে বাড্ডা থানাধীন আফতাবনগর এলাকার একটি ঝিলে পুঁতে রাখে। সোমবার সেই ঝিলে জিসানের মরদেহ ভেসে উঠলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। বাড্ডা থানার পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। জিসান অপহরণের পরদিন তার বাবা মোফাজ্জেল হোসেন খিলগাঁও থানায় একটি নিখোঁজের জিডি করেন। সেই জিডির সূত্রধরে তদন্ত চালায় খিলগাঁও থানা পুলিশ। কিন্তু তারা জিসানকে উদ্ধার করতে পারেনি। এমনকি বাড্ডার পুলিশ সোমবার তার মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠালেও জানতে পারেনি খিলগাঁও পুলিশ। উদ্ধারের একদিন পরে মঙ্গলবার খবর পেয়ে খিলগাঁও পুলিশ ঢামেক মর্গে গিয়ে জিসানের বাবার দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী লাশ শনাক্ত করে। জিসান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৩) চারজনকে আটক করেছে। তারা হলেন, জিসানের বাবার গ্যারেজের ম্যানেজার কাওসার, একই গ্যারেজের রিকশাচালক শাহীন ও তার ভাই মাসুদ এবং শরিফুল। র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। সূত্র জানায়, আসামিরা জিসানকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে ইট দিয়ে ঝিলের মধ্যে পুঁতে রাখে।

জিসানের বড় বোন, তাসমিয়া সৃষ্টি মানবজমিনকে বলেন, আমরা দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে জিসান তৃতীয়। সে সবার আদরের ছিল। ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছিল। কিন্তু ওরিয়েন্টেশন ছাড়া আর কোনো ক্লাসও করতে পারেনি। শুক্রবার সে গোসল করে নামাজ পড়তে যায়। সেখান থেকে বাবার সঙ্গে এক আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াত খেয়ে গ্যারেজে যায়। তারপর আবার বাসার সামনে আসে। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে শুক্রবার রাত ৪টা ৮ মিনিটে জিসানের মোবাইল ফোন থেকে বাবার মোবাইলে “আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, কোনো ধরনের চালাকি বা পুলিশ- পাবলিক জানালে ভালো হবে না” এ ধরনের একটি এসএমএস আসে। রাত ৪টা ৩২ মিনিটে আরেকটি মেসেজ আসে “আমাদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ দিলে আপনার ছেলেকে ছাড়া হবে। সময় ২ দিন। চাহিদা ১৫ লাখ। চালাকি করলে ছেলে হারাবেন”। পরের দিন সকালে অপহরণকারীরা আবারো এসএমএস পাঠায় “যদি জিসানকে চাও সোমবার বেলা ১২টায় ১৫ লাখ টাকা নিয়া কুমিল্লা স্টেশন রোডে আসবা। জিসান এখন চিটাগাং। পুলিশকে জানালে ভালো হবে না”। তাসমিয়া বলেন, ২১ তারিখ রাত ৮টা ৪৩ মিনিটে আরেকটি এসএমএস দেয় “একদিনে ৩ লাখ, ৪দিন সময় নাও, সাবধান চালাক হইও না তাহলে ছেলের মুখ দেখা লাগবো না। ফেসবুকে ছবি দিবা, ছবি পাঠাই, সময় নষ্ট করবেন না। আপনি লোক লাগালে খরচ হবে” এরকম আরো অনেক এসএমএস ও মোবাইলে ফোনে কথা বলে হুমকি ধামকি দিতে থাকে। এমনকি জিসানের মরদেহ যখন মর্গে তখনও তারা ফোন দিয়ে আমার কাছে মুক্তিপণের টাকা চেয়েছে। আমি ফোনে তাদেরকে বললাম টাকা রেডি আছে আপনারা যা চান তাই দেব। শুধু একবার আমরা জিসানের সঙ্গে কথা বলবো। কিন্তু তারা রাজি হয়নি। তারা বলে, এক জায়গায় টাকা রাখবেন আর দূর থেকে আমরা জিসানকে দেখিয়ে দেব। তাসমিয়া বলেন, আমি অনেক আকুতি মিনতি করেছি জিসানের সঙ্গে কথা বলার জন্য কিন্তু তারা রাজি হয়নি। আমি বলেছি, আপনারা আমার ভাইয়ের সঙ্গে মিশেছেন। ও অনেক ভালো। বয়সও বেশি না। তাকে আপনারা মারবেন না। কোনো কষ্ট দেবেন না। তখন তারা বলে এতদিন মারিনি। তাকে কোনো কষ্ট দেইনি। কিন্তু এখন কষ্ট দিতে হবে। এর পরেই জানতে পারি অজ্ঞাত একটি মরদেহ ঢামেক মর্গে আছে। গিয়ে দেখি ওই মরদেহই আমাদের জিসানের। তিনি আরো বলেন, র‌্যাব যাদেরকে আটক করেছে তাদের একজনের কণ্ঠের সঙ্গে আমাকে ফোন দিয়ে যে কথা বলেছে তার কণ্ঠ হুবহু মিলে গেছে। প্রকৃত আসামিদেরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জিসানের বাবা মোফাজ্জল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ওইদিন সে আমার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিয়ে যায়। পরে গ্যারেজের আশপাশেই ঘুরাঘুরি করে। কিন্তু সন্ধ্যা হলে তার আর কোনো খোঁজ মিলেনি। একবার তার মোবাইলে ফোন দিলে সে বলে গ্যারেজের সামনেই আছে। কিন্তু আমার ভাতিজা হাফিজকে দিয়ে খোঁজ নিলে তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। অনেক জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইলে কল আর এসএমএস-এ জানতে পারি সে অপহরণ হয়েছে। মোফাজ্জল হোসেন বলেন, মূলত তারা আমার কাছ থেকে টাকা নেয়ার জন্য এমনটাই করেছে। কারণ যারা জিসানকে অপহরণ করেছে তারা সবাই আমার কাছাকাছি থাকতো। শাহীন নামের এক ছেলে জিসানের সমবয়সী। তার সঙ্গে আমার ছেলে চলাফেরা করতো। তবে শাহীনের পেছনে আরো অনেকে আছে।

নিহত জিসানের চাচাত ভাই ও গ্যারেজের ব্যবস্থাপক হাফিজ মানবজমিনকে বলেন, ওইদিন বিকালে জিসান রিকশাচালক শাহীনের সঙ্গে ঘুরছিল। আমি তখন তাকে বলেছি দুষ্টুমি না করার জন্য। কিন্তু সে খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে। তখন জিসানের মোবাইলে একটা ফোন আসলে রিসিভ করে শাহীন। আবার সে চাচার কাছ থেকে টাকা নিয়ে কয়েকজন রিকশাচালককে খাইয়ে দেয়। এর কিছুক্ষণ পর চাচার ফোন পেয়ে আমি জানতে পারি জিসানকে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন আমি শাহীনকে অনেক খোঁজাখুঁজি করি। কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার কিছুক্ষণ পর শাহীন এসে বলে জিসান বাসায় চলে গেছে। হাফিজ বলেন, আমি তখনই শাহীন, মাসুদ ও শরিফুলের কথা ও চলাফেরা দেখে বুঝতে পারি তারাই এই কাজ করেছে। কারণ তারা চাচার অনেক বিষয়ে জানতো। জিসান নিখোঁজের দুদিন আগে চাচা ১৫ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তোলার কথা বলছিলেন। সেই কথাগুলো শাহীন, মাসুদ, শরীফুল শুনেছে। এই টাকার লোভেই তারা জিসানকে অপহরণ করেছে। এদিকে জিসান হত্যাকাণ্ডের খবরে উত্তর গোড়ান এলাকায় শোকের ছায়া নেমেছে। সর্বস্তরের প্রতিবেশীরা জিসানকে শেষবারের মতো দেখার জন্য তার বাসা-কবর স্থানে ভিড় জমায়। সবারই একই কথা। হত্যাকারীরা জিসানের মতো ভালো ছেলেকে কিভাবে হত্যা করলো। জিসান নাই তাই কয়েকদিন ধরে এলাকাটা ঠাণ্ডা হয়ে আছে। কারণ পুরো এলাকাটা সে হই-হুল্লোড়ে মাতিয়ে রাখতো।

28-Jan-2018 12:46 pm

Published
28-Jan-2018